হরমুজ প্রণালি বন্ধে পণ্য সরবরাহ সমস্যা

এশিয়ার সংকটের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পড়ার আশঙ্কা

ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এশিয়াজুড়ে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

এশিয়ার এ সরবরাহ সংকট এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এশিয়ার বাজারে পণ্য ও কাঁচামালের যে সংকট শুরু হয়েছে, তার প্রভাব শিগগির যুক্তরাষ্ট্রেও পড়তে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত আমেরিকানরা মূলত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এ সংকটের আঁচ পাচ্ছে, তবে সামনের দিনগুলোয় প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো জরুরি কাঁচামালের অভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চরম সংকট দেখা দিতে পারে। খবর সিএনএন।

বর্তমানে এশিয়ার পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। বেশকিছু দেশে পেট্রল পাম্পগুলোয় জ্বালানি তেল রেশন করে বিক্রি করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং কারখানাগুলো প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতির মূল কারণ হলো ইরান ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়া। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট পলিপ্রোপাইলিনের ২৫ শতাংশ এবং পলিথিন উৎপাদনের ২০ শতাংশ কাঁচামাল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আধুনিক বিশ্বের চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের প্যাকেট তৈরির জন্য এ রাসায়নিক উপাদানগুলো অপরিহার্য।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবাই শুধু অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আর জ্বালানি নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু পেট্রোকেমিক্যাল বা রাসায়নিক কাঁচামালের যে সংকট তৈরি হচ্ছে তা সমানভাবে উদ্বেগজনক। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের বেশকিছু বড় বড় রাসায়নিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছে, কাঁচামালের অভাবে তারা সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারবে না। সংকট এখন কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা উৎপাদন খাতের গভীরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দেশটির সাধারণ মানুষ যে পণ্য ব্যবহার করে, তার প্রায় অর্ধেকই আসে এশিয়া থেকে। এশিয়ার কারখানাগুলো যদি কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দেয় বা জ্বালানি সংকটের কারণে শ্রমিকরা কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানির গতি থমকে যাবে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এ সংকটের মুখে কতটা অসহায়, তা হয়তো এখনো অনেকে বুঝতে পারছে না। অতীতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেত, কিন্তু এবারের যুদ্ধ আকস্মিক হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ পাননি।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের কোনো সংকটে পড়েনি। কারণ দেশটি নিজের প্রয়োজনীয় জ্বালানির একটি বড় অংশ নিজেই উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জ্বালানি আমদানির মাত্র ৭ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এ কারণে এখন পর্যন্ত এর প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এ স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী নাও হতে পারে। করোনাকালের অভিজ্ঞতার পর অনেক কোম্পানি তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত করলেও প্লাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো কাঁচামাল সাধারণত খুব বেশি পরিমাণে মজুদ করে রাখা হয় না।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি হরমুজ প্রণালি এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় ৭০ কোটি ব্যারেল কমে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক পণ্যের সংকট দেখা দেবে এবং চার মাসের মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামের অভাবে গাড়ি নির্মাণ শিল্পে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। মার্কিন অর্থনীতি গত কয়েক বছরে বেশ শক্তিশালী হলেও বিশ্ববাজারের এ আন্তঃনির্ভরশীলতা দেশটিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সবশেষে, এ সংকটের গভীরতা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর। যদি গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত এ নৌপথ বন্ধ থাকে, তবে তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের বাজারেও হাহাকার শুরু হতে পারে। এশিয়ার বাজারে যে সরবরাহ সংকট শুরু হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এখন সবার নজর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। কারণ হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত উন্মুক্ত হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।

আরও